যে ঘরে খাবার ছিল না! কিন্তু আল্লাহর ওপর ভরসা ছিল! ইসলামিক শিক্ষামূলক গল্প

যে ঘরে খাবার ছিল না, কিন্তু আল্লাহর ওপর ভরসা ছিল


ফাঁকা হাঁড়ি

রাত তখন অনেক গভীর। গ্রামের ছোট্ট পথগুলোতে কেউ নেই, শুধু দূরে কোথাও একটা কুকুরের ডাক ভেসে আসছে, আর মাঝে মাঝে বাতাসে কেঁপে উঠছে টিনের চাল। গ্রামের একেবারে শেষ মাথার ছোট্ট একটি মাটির ঘরে তখনও আলো জ্বলছিল — একটা পুরোনো কেরোসিনের বাতির আলো।

গরিব থেকে ধনী
গরিব থেকে ধনী

সেই আলোয় মাটির চুলার পাশে বসে ছিল মরিয়ম। অনেকক্ষণ হাঁড়ির ঢাকনাটা হাতে ধরে রেখেছিল মরিয়ম, যেন ঢাকনা খুললেই বাস্তবতা টা আরও সত্যি হয়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত ধীরে ধীরে ঢাকনাটা তুলল। হাঁড়ির ভেতর কিছুই নেই, এক মুঠো চালও ছিলো না। কিছুক্ষণ সে ফাঁকা হাঁড়িটার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর নিঃশব্দে ঢাকনাটা আবার বসিয়ে দিল। চোখের কোণে পানি জমে উঠেছিল, কিন্তু সে কাঁদল না — কারণ ঘরের অন্য পাশে তার স্বামী ইয়াসিন বসে ছিল।

সারাদিন কাজ খুঁজে ক্লান্ত হয়ে ফিরেছে মানুষটা। চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ, পায়ের ধুলোটুকুও এখনো পরিষ্কার করেনি। মরিয়ম জানত, ইয়াসিনকে যদি সে বলে ঘরে খাবার নেই, তাহলে মানুষটা আরও ভেঙে পড়বে। তাই কিছু বলল না। কিন্তু ইয়াসিন নিজেই বুঝে গেল। স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে আস্তে করে জিজ্ঞেস করল, "কিছু নেই?" মরিয়ম মাথা নিচু করে শুধু বলল, "না।"

কিছুক্ষণ দুজনের মধ্যে কোনো কথা হলো না। তারপর ইয়াসিন একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলল, "আজও কাজ পেলাম না।"

মরিয়ম স্বামীর দিকে তাকিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করল। "কাল পাবে, ইনশাআল্লাহ।"

ইয়াসিন মৃদু হেসে বলল, "তুমি সবসময় 'ইনশাআল্লাহ' বলো। তোমার ভয় করে না?"

"কিসের?" — অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল মরিয়ম। "যদি কালও কিছু না হয়?"

মরিয়ম কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল, তারপর বলল, "কাল কী হবে সেটা আমি জানি না। কিন্তু কালকের মালিক কে, সেটা আমি জানি।"

ইয়াসিন আর কিছু বলতে পারল না। তার চোখটা ভিজে গেল।


শেষ খাবার

মরিয়ম
মরিয়ম

ঘরের এক কোণে একটা ছোট কাপড়ের পুঁটলি ছিল। মরিয়ম সেটা এনে খুলল — ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো একটা শুকনো রুটি, তাদের ঘরের শেষ খাবার। রুটিটা ইয়াসিনের হাতে দিয়ে সে বলল, "তুমি খেয়ে নাও।"

"তুমি?" — সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করল ইয়াসিন। "আমি খেয়েছি।"

ইয়াসিন স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সে জানত মরিয়ম মিথ্যা বলছে, কারণ তার চোখের নিচে ক্ষুধার ক্লান্তি স্পষ্ট। তাই রুটিটা মাঝখান থেকে দুই টুকরো করে একটা মরিয়মের হাতে দিয়ে বলল, "আমার সামনে মিথ্যা বলা যাবে না।"

মরিয়মের চোখ দিয়ে এবার পানি গড়িয়ে পড়ল। "তুমি জানো না, আমি তোমাকে না খাইয়ে কীভাবে খেতে পারি?"

ইয়াসিন হেসে বলল, "আর তুমি জানো না, তোমাকে না খাইয়ে আমি কীভাবে খেতে পারি?"

দুজনেই অল্প অল্প করে সেই শুকনো রুটিটা খেল। খাবার শেষ হয়ে গেল, কিন্তু ক্ষুধা শেষ হলো না।

সেই রাতের সিজদা

রাত আরও গভীর হলো। ইয়াসিন বলল, "চলো নামাজ পড়ি।" মরিয়ম ওযু করতে গেল — পানি ছিল সামান্যই, তবু তারা ওযু করল। তারপর দুজন নামাজে দাঁড়াল। ঘরের বাইরে তখন প্রচণ্ড বাতাস, কিন্তু ঘরের ভেতর দুজন মানুষ চুপচাপ আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

নামাজ শেষে ইয়াসিন সিজদায় মাথা রাখল। অনেকক্ষণ মাথা তুলল না। তার কণ্ঠ কাঁপছিল। "হে আল্লাহ… আমি দুর্বল। আমি গরিব। আমার হাতে কিছু নেই। কিন্তু তুমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই।" গলা ভারী হয়ে এলো তার। "আমার স্ত্রীকে আমার কারণে কষ্ট দিও না, আল্লাহ।"

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মরিয়ম আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। কাঁদতে কাঁদতে বলল, "হে আল্লাহ… আমরা অনেক কিছু চাই না। শুধু এতটুকু দাও, যেন অভাবের কারণে তোমাকে ভুলে না যাই।"

সেই রাতে তাদের ঘরে খাবার ছিল না, টাকা ছিল না, কোনো আশাও যেন ছিল না। কিন্তু তাদের দুজনের হৃদয়ে একটা জিনিস ঠিকই ছিল — আল্লাহর ওপর ভরসা।

 

পরদিন সকাল

ফজরের আজান হলো। ইয়াসিন নামাজ পড়ে আবার বেরিয়ে গেল কাজের সন্ধানে। এক জায়গায় গেল, কাজ নেই। আরেক জায়গায় গেল, সেখানেও নেই। দুপুর হয়ে এলো, পেট খালি, পকেটে এক টাকাও নেই। হাঁটতে হাঁটতে সে বাজারের পাশে এসে বসে পড়ল।

ঠিক তখনই তার চোখে পড়ল একজন বৃদ্ধ মানুষ, রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে একটা ভারী বস্তা তুলতে চেষ্টা করছেন। ইয়াসিন কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল — নিজের শরীর তখন দুর্বল, তবু উঠে দাঁড়াল। "চাচা, দিন। আমি তুলে দিচ্ছি।"

"তুমি পারবে?" — জিজ্ঞেস করলেন বৃদ্ধ।

"চেষ্টা করতে তো পারি," হেসে বলল ইয়াসিন।

বস্তাটা কাঁধে তুলে নিল সে। বৃদ্ধের বাড়ি অনেক দূর, পুরো পথ বস্তাটা কাঁধে নিয়েই হাঁটল ইয়াসিন। বৃদ্ধ বারবার বলছিলেন, "বাবা, তুমি নামিয়ে রাখো। অনেক ভারী।" কিন্তু ইয়াসিন শুধু বলল, "চাচা, আপনি চিন্তা করবেন না।"

বাড়িতে পৌঁছে বৃদ্ধ তার হাতে কিছু টাকা দিতে চাইলেন। ইয়াসিন প্রথমে নিতে চাইল না। "না চাচা, আপনার কাজ ছিল। আমি করে দিয়েছি।"

বৃদ্ধ তার দিকে তাকিয়ে বললেন, "তুমি কি কাজ খুঁজছ?"

ইয়াসিন থমকে গেল। "জি।"

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, "আমার একটা গুদাম আছে। সেখানে একজন সৎ মানুষ দরকার। তুমি কাল থেকে আসবে?"

ইয়াসিন কিছু বলতে পারল না, চোখ ভিজে উঠল। শুধু বলল, "ইনশাআল্লাহ।"


ছোট্ট একটা চাকরি

ইয়াসিন
ইয়াসিন

পরদিন থেকে ইয়াসিন গুদামে কাজ শুরু করল। বেতন খুব বেশি ছিল না, কিন্তু নিয়মিত ছিল। প্রথম বেতন হাতে পাওয়ার দিন সে বাজারে গিয়ে চাল, ডাল, তেল কিনল, আর স্ত্রীর জন্য একটু মিষ্টি। বাড়িতে ফিরে সবকিছু মরিয়মের সামনে রাখল।

মরিয়ম কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল, তারপর শুধু বলল, "আজ হাঁড়িটা খালি থাকবে না।"

ইয়াসিন হাসল। "না।"

মরিয়ম চোখ মুছে বলল, "আমি জানতাম।"

"কী জানতা?" — অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল ইয়াসিন।

"আল্লাহ আমাদের ফেলে রাখবেন না।"


নতুন জীবনের শুরু

কয়েক বছর কেটে গেল। ইয়াসিন তার সততা আর পরিশ্রম দিয়ে গুদামের মালিকের বিশ্বাস অর্জন করল। একদিন মালিক তাকে বললেন, "তুমি কি আমার সঙ্গে ব্যবসা করবে?" ইয়াসিন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না।

সেখান থেকেই শুরু হলো নতুন জীবন। ছোট ব্যবসা, তারপর একটু বড়, তারপর আরও বড়। যে মানুষটা একসময় এক টুকরো শুকনো রুটি ভাগ করে খেত, কয়েক বছর পর তার নিজের বড় ব্যবসা হলো। কিন্তু একটা জিনিস বদলাল না — তার সিজদা।


পুরোনো ঘরে ফিরে

অনেক বছর পর একদিন ইয়াসিন আর মরিয়ম সেই পুরোনো বাড়িতে গেল। ঘরটা প্রায় ভেঙে পড়েছে, পুরোনো চুলাটা এখনো এক কোণে পড়ে আছে। মরিয়ম চুপচাপ চুলাটার সামনে দাঁড়াল, চোখে পানি। ইয়াসিন পাশে এসে দাঁড়াল।

"মনে আছে?" — জিজ্ঞেস করল মরিয়ম।

ইয়াসিন মাথা নেড়ে বলল, "মনে আছে।"

"সেদিন ঘরে খাবার ছিল না।"

"হ্যাঁ।"

"তুমি আমাকে বলেছিলে, 'কাল কাজ পাব।'"

ইয়াসিন মৃদু হাসল। "আমি তো জানতাম না সত্যিই পাব কি না।"

"কিন্তু আমি জানতাম," বলল মরিয়ম. ইয়াসিন স্ত্রীর দিকে তাকাল। মরিয়ম ধীরে ধীরে বলল, "কারণ আমি জানতাম, আল্লাহ আমাদের দেখছেন।"

ইয়াসিনের চোখ দিয়ে পানি পড়ে গেল। সে পুরোনো মাটির মেঝেতে বসে পড়ল — যে মেঝেতে একদিন তারা ক্ষুধার্ত অবস্থায় নামাজ পড়েছিল। মাথা নিচু করে বলল, "মরিয়ম… আমরা সেদিন ভেবেছিলাম আল্লাহ আমাদের শুধু খাবার দেবেন।"

"কিন্তু?" — জিজ্ঞেস করল মরিয়ম।

চোখ মুছে ইয়াসিন বলল, "তিনি আমাদের তার চেয়েও বড় কিছু দিয়েছেন।"

"কী?"

ধীরে ধীরে ইয়াসিন বলল, "অভাবের মধ্যেও তাঁকে বিশ্বাস করার শক্তি।"


শেষ কথা

মানুষ যখন বিপদে পড়ে, তখন অনেক সময় মনে হয় — "আল্লাহ কি আমাকে দেখছেন না?" কিন্তু মনে রাখবেন, আপনার চোখ হয়তো শুধু বন্ধ দরজাটাই দেখছে। আল্লাহ হয়তো ইতিমধ্যে আপনার জন্য অন্য একটা দরজা খুলে দিয়েছেন, যেটা আপনি এখনো দেখতে পাচ্ছেন না।

ইয়াসিনের জীবনে পরিবর্তন এক রাতে আসেনি। কোনো জাদুর মতো টাকা আকাশ থেকে পড়েনি। বরং আল্লাহ তার জন্য মানুষের মাধ্যমে, কাজের মাধ্যমে, সুযোগের মাধ্যমে রিজিকের পথ খুলে দিয়েছেন। তাই কষ্টের সময় নামাজ ছেড়ে দেবেন না, দোয়া ছেড়ে দেবেন না। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ — আল্লাহর ওপর ভরসা ছেড়ে দেবেন না।

কারণ কখনো কখনো, আপনার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার রাতটাই হতে পারে আপনার নতুন জীবনের আগের রাত।

 


Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.